রবিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৪

শবযাত্রা


ভাইসব আজ বিকাল তিন ঘটিকায় কড়াই গ্রামের ঈদগাহ মাঠে এক বিরাট ফুটবল ফাইনাল খেলার আয়োজন করা হইয়াছে। উক্ত খেলায় অংশগ্রহণ করবেন কড়াই গ্রাম একাদশ বনাম সিধুলী গ্রাম একাদশ। উক্ত খেলায় আপনারা সকলে আমন্ত্রিত।
এভাবেই মাইকিং করছিল কড়াই গ্রামের বাবুল মিয়া। সবাইকে আজ বিকাল বেলায় তাদের মাঠে খেলা দেখার আমন্ত্রণ জানানো হল।

বিকাল তিনটার পূর্বেই আশে পাশে পাশের গ্রাম থেকে হাজার হাজার লোক খেলা দেখতে কড়াই গ্রামের ঈদগাহ মাঠে উপস্থিত হলো। লোকে লোকারন্য হয়ে গেল খেলার মাঠের চারপাশ। নির্দিষ্ট সময়ে খেলা শুরু হলো।
দু’দলই সমান তালে খেলছে। দু’দলই মরিয়া হয়ে উঠছে পুরস্কার নেয়ার জন্য। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কে জিতে। প্রথমার্ধ খেলা শেষে দু’দলে ফলাফল দাঁড়াল কড়াই গ্রাম একাদশ=০, সিধুলী গ্রাম একাদশ=০।
বিরতীর পর আবার খেলা শুরু হলো। খেলার শেষ মূহূর্তে এসে পেলান্টি শুটে একটি গোল দিল সিধুলী গ্রাম একাদশ। কিন্তু কড়াই গ্রামের নিজের গ্রামে খেলা হচ্ছে তাদের দর্শক সমর্থক বেশী তারা তা মেনে নিতে পারছে না। এই নিয়ে রেফারীর সাথে তর্কে জড়িয়ে পরে বেশ কয়েকজন কড়াই গ্রামের খেলোয়ার।
জীবন মরণ লড়াই করে শেষ মূহূর্তে একটি গোল দিল সিধুলী গ্রামের খেলোয়ারা তারাই বা কেন মেনে নিবে কড়াই গ্রামের অন্যায় আবদার। তাই তারা এর তীব্র প্রতিবাদ করার জন্য এগিয়ে গেল। কিন্তু কড়াই গ্রামের নিজের মাঠ বলে শক্তির লড়াই দেখাচ্ছে। এ নিয়ে তুমুল হট্টগোল বেঁধে গেল। এক পর্যায়ে সিধুলী গ্রামের খেলোয়ার আমিনুল কড়াই গ্রামের একজন খেলোয়ারকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। তখন কড়াই গ্রামের খেলোয়াররা আর বসে থাকতে পারেনি। তারাও পাল্টা আক্রমন করল। এক পর্যায়ের দর্শকরাও মাঠে প্রবেশ করল। দু‘পক্ষের লোকজনদের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ বেঁধে গেল। এতে করে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়। তবে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয় সিধুলী গ্রামের লোকজনদের। তারা তখন আঘাত পেয়ে তাদের গ্রামে চলে আসল।
কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ হয়নি। পরদিন বল্লম, ছুরা, তীর, টেঁটা ইত্যাদি দেশীয় অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সিধুলী গ্রামের লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে কড়াইগ্রামের লোকজনদের উপর হামলা চালায় এবং কড়াইগ্রামের সমস্ত বাড়ীঘর ভাংচুর করে। লুটপাট করা হয় তাদের মালামাল। জবাবে কড়াইগ্রামের লোকজনও বল্লম, ছুরা, তীর, টেঁটা ইত্যাদি নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে। দু’গ্রামের বেশ কয়েকজন আহত হয় এবং কড়াই গ্রামের একজন নিহত হয়।
এই ঘটনার খবর পুলিশ জানতে পেরে ঘটনাস্থলে তৎক্ষনাত এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে এবং দুগ্রামে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
পরদিন দেশের সকল দৈনিক পত্রিকায় এবং ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়াগুলোতো এ সংঘর্ষের প্রচার করা হয়। তখন কড়াই গ্রামের লোকজন বাদী হয়ে সিধুলী গ্রামের ২৭ জন আসামীর নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করা হয়। যাকে নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত হয় সেই আমিনুলের বাপ চাচারা ছিল সাত ভাই। আমিনুল ও তার বাপ চাচা সবাইকে এ মামলায় আসামী করা হয়।
পরদিন পুলিশ আসামী ধরতে এসে গ্রামের কোন পুরুষকে খুঁজে পায়নি। পুরুষ শূন্য গ্রাম হয়ে গেল।
আদালত আগামী ২০ অক্টোবর সোমবার সকল আসামীকে হাজিরার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। নির্দিষ্ট তারিখে সিধুলী গ্রামের ২৭জন আসামী নাটোর আদালতে হাজিরা দেয়ার জন্য একটি লোকাল বাসে আদালতে হাজির হয়। হাজিরা শেষে বাড়ি ফেরার পথে ঘটে বিরাট দুঘর্টনা।
বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা রাজশাহীগামী যাত্রীবাহী কোচ কেয়া পরিবহন ও নাটোর থেকে নাটোরের গুরুদাসপুরগামী আসামীদের লোকাল বাস অথৈ পরিবহনের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। ঘটনাস্থলেই নিহত হয় ৩৫ জন এবং আহত হয় অর্ধশত।
আহতদের চিকিৎসার জন্যে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের বড়াইগ্রাম মোড়ের আগে রেজুর মোড়ে কেয়া পরিবহনের বাসটি একই দিক থেকে আসা একটি ট্রাককে ওভারটেক করার সময় অথৈ পরিবহনের বাসটির সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। বিকট শব্দে মুখোমুখি সংঘষের পর মহাসড়কের দুই পাশের দুটি গর্তে বাস দুটি সিটকে পড়ে দুমড়ে মুচড়ে যায়। ঘটনার সময় রাস্তা ও আশে পাশে আহত ও নিহতরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে। এ সময় আহতদের আর্তচিৎকার ও দুর্ঘটনার শব্দে শত শত এলাকাবাসী ছুটে এসে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। খবর পেয়ে নাটোর, লালপুর ও দয়ারামপুর ফায়ার সার্ভিস ও থানা এবং হাইওয়ে পুলিশ এলাকাবাসীর সাথে উদ্ধার তৎপরতায় যোগ দেয়। সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই গাড়ির চালকসহ ৩৫টি লাশ উদ্ধার করে ট্রাকে বনপাড়া হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। আহতদের মধ্যে নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের ভর্তি অজ্ঞাত আরো পাঁচজন বিকেলে মারা যান। আহতদের নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতাল, বড়াইগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বনপাড়ার বেসরকারি আমিনা হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
অথৈ পরিবহনের যাত্রীদের মধ্যে সবাই ছিলেন সিধুলী গ্রামের। তারা হাজিরা দিয়ে বাড়ি ফিরছিল। অথৈ পরিবহনে থাকা সিধুলী গ্রামের আমিনুলের ৬ চাচাসহ ১৪ জন মারা যায়। আমিনুলে বাপ চাচারা সাত ভাইয়ের মধ্যে একমাত্র আমিনুলের বাবাই আহত অবস্থায় হাসপাতালে আছে। তিনিও মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন।
নাটোরের বড়াইগ্রামে স্মরনকালের ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় নিহত ৩৫ জনের পরিবারে চলছে এখন শোকের মাতম। বিশেষ করে সিধুলী গ্রামে লাশের মিছিল হচ্ছে। জানাজা আর দাফনের সময় উপস্থিত স্বজন আর জনতার উচ্চস্বরের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে এলাকার সিধুলীর আকাশ বাতাস। নিহতদের জানাজার জন্য বাড়ি থেকে লাশগুলো স্কুল মাঠে নেয়ার সময় পুরো সিধুলী গ্রামে কান্নার রোল পড়ে যায়। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে জানাজায় আগত হাজারো মানুষ তাদের চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। সিধুলী গ্রাম যেন এখন শোকের গ্রামে পরিনত হয়েছে। দুর্ঘটনার পর থেকেই গ্রামটি মুহ্যমান হয়ে আছে শোকে। উঠানে লাশ নিয়ে রাত কাটিয়েছে তারা। গতকাল দিনের প্রথম ভাগ কেটেছে দাফন-কাফনের কাজে। পাশাপাশি খোঁড়া হয়েছে ১৪ জনের কবর। কবরের দিকে তাকালে বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে।
সকাল ১০টায় কবরস্থান সংলগ্ন সিধুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জানাজা পড়ানো হয়। স্থানীয় সাংসদ সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী জনপ্রতিনিধিসহ কয়েক হাজার মানুষ জানাজায় অংশ নেন।
খাটিয়ায় করে সারিবদ্ধভাবে লাশগুলো যখন জানাজার জন্য আনা হচ্ছিল, তখন স্বজনদের কান্নায় শোকবিহ্বল হয়ে ওঠে গ্রামের পরিবেশ। শান্ত সবুজ গ্রামের ভেতর দিয়ে লাশের পর লাশ কাঁধে নিয়ে চোখের পানিতে হয়েছে সিধুলী গ্রামের শবযাত্রা।
রচনাকাল: ২৬ অক্টোবর, ২০১৪ খ্রি:

কোন মন্তব্য নেই: